সম্রাট হর্ষবর্ধন কী বাংলার স্বাধীন রাজা শশাঙ্ককে থামাতে পেরেছিল?

সপ্তম শতকের প্রাচীন ভারতের ইতিহাস ছিল চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার লড়াইয়ে পূর্ণ। এই সময়ে উত্তর ভারতের অধিপতি কনৌজের সম্রাট হর্ষবর্ধন এবং বাংলার প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম নরপতি রাজা শশাঙ্কের মধ্যকার দ্বন্দ ছিল তৎকালীন রাজনীতির মূল আকর্ষণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, উত্তর ভারতের পরাক্রমশালী সম্রাট হর্ষবর্ধন কি সত্যিই বাংলার প্রতাপশালী রাজা শশাঙ্ককে পরাস্ত বা দমন করতে পেরেছিলেন?

ইতিহাসের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সম্রাট হর্ষবর্ধন তাঁর জীবনদ্দশায় শশাঙ্ককে পুরোপুরি থামানো বা জয় করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

১. সংঘাতের পটভূমি

কনৌজের শাসক রাজ্যবর্ধন (হর্ষবর্ধনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা) এবং মালবের রাজার যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দের সূত্রপাত। হর্ষবর্ধনের ভগ্নিপতি গৃহবর্মাকে হত্যা করা হলে রাজ্যবর্ধন মালব অভিযান করেন। এ সময় গৌড়রাজ শশাঙ্ক কনৌজ ও মালবের রাজপরিবারের মধ্যকার এই দ্বন্দে হস্তক্ষেপ করেন এবং কৌশলগত কারণে রাজ্যবর্ধনকে হত্যা করেন।

ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ এবং বোন রাজ্যশ্রীকে উদ্ধারের পণ নিয়ে ১৬ বছর বয়সে কনৌজের সিংহাসনে বসেন হর্ষবর্ধন। শশাঙ্ককে উচ্ছেদ করার উদ্দেশ্যে তিনি কামরূপের (আসাম) রাজা ভাস্করবর্মনের সাথে একটি শক্তিশালী সামরিক মিত্রতা গড়ে তোলেন।

২. হর্ষবর্ধনের সামরিক অভিযান ও বাস্তবতা

শশাঙ্ককে শাস্তি দিতে হর্ষবর্ধন বিশাল বাহিনী নিয়ে পূর্ব অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করেন। তবে এই সামরিক অভিযানের ফলাফল নিয়ে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের বিবরণ এবং বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’ কাব্য পর্যালোচনা করলে ঐতিহাসিক সত্য সামনে আসে:

  • আংশিক দখল ও শশাঙ্কের পিছু হটা: হর্ষবর্ধন ও ভাস্করবর্মনের যৌথ বাহিনীর চাপে শশাঙ্ক কৌশলগতভাবে গৌড়ের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ ছেড়ে ওড়িশা (কনগোদা) অঞ্চলে সরে যান। হর্ষবর্ধন কনৌজ ও গৌড়ের কিছু অংশ সাময়িকভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন।
  • শশাঙ্কের সার্বভৌমত্ব বহাল: রাজধানী ছেড়ে গেলেও শশাঙ্ক তাঁর রাজ্যের মূল শক্তি হারাননি। তিনি দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা, ওড়িশা এবং বিহারের কিছু অংশজুড়ে নিজের শাসন পূর্ণ শক্তিতে টিকিয়ে রাখেন। হর্ষবর্ধন শশাঙ্কের সাম্রাজ্য পুরোপুরি গ্রাস করতে বা তাঁকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে পারেননি।

৩. হিউয়েন সাঙের সাক্ষ্য ও ঐতিহাসিক প্রমাণ

চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ (যিনি হর্ষবর্ধনের পরম ভক্ত ছিলেন) তাঁর বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন যে, শশাঙ্কের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত গৌড় এবং তার আশেপাশের অঞ্চলে শশাঙ্কের প্রভাব অক্ষুণ্ণ ছিল। হর্ষবর্ধনের মতো শক্তিশালী শাসক থাকা সত্ত্বেও শশাঙ্ক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত (আনুমানিক ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দ) স্বাধীনভাবেই রাজত্ব করে গেছেন।

শশাঙ্কের জীবদ্দশায় হর্ষবর্ধন কিংবা ভাস্করবর্মন কাউকেই বাংলায় স্থায়ী কর্তৃত্ব স্থাপন করতে দেখা যায়নি।

৪. শশাঙ্কের মৃত্যুর পর পরিবর্তন

শশাঙ্কের মৃত্যুর পরই কেবল হর্ষবর্ধন ও কামরূপরাজ ভাস্করবর্মন গৌড় ও মগধ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন। অর্থাৎ, শশাঙ্ককে যুদ্ধে পরাজিত বা হত্যা করে নয়, বরং শশাঙ্কের স্বাভাবিক মৃত্যুর পরেই হর্ষবর্ধন বাংলা অঞ্চলে তাঁর পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করতে সমর্থ হন।

উপসংহার

সংক্ষেপে বলতে গেলে, সম্রাট হর্ষবর্ধন রাজা শশাঙ্ককে সাময়িকভাবে প্রতিহত করতে এবং তাঁর সাম্রাজ্যের বিস্তার থামাতে পেরেছিলেন, কিন্তু শশাঙ্ককে স্থায়ীভাবে পরাজিত, বন্দী বা থামাতে তিনি সফল হননি। রাজকীয় কূটনীতি, সামরিক প্রজ্ঞা এবং ভৌগোলিক সুবিধার কারণে রাজা শশাঙ্ক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করতে পেরেছিলেন। তাই ইতিহাসে সম্রাট হর্ষবর্ধন মহা-পরাক্রমশালী রাজা হিসেবে পরিচিত হলেও, স্বাধীন গৌড়রাজ শশাঙ্ক তাঁর কাছে এক অদম্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই থেকে যান।

পলাশীর যুদ্ধ কী নবাবের পক্ষে জয় করা সম্ভব ছিলো?

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন সংঘটিত পলাশীর যুদ্ধ ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি অন্যতম প্রধান মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা। ঐতিহাসিক পরিমন্ডলে বহুল আলোচিত প্রশ্ন হলো—নবাব সিরাজউদ্দৌলার পক্ষে কি এই যুদ্ধে বিজয় অর্জন করা সম্ভব ছিল? এই প্রবন্ধে পলাশীর যুদ্ধের সামরিক সক্ষমতা, ভৌগোলিক অবস্থান, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তসমূহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে যে, কেবল সামরিক শক্তির বিচারে নবাবের বিজয় সুনিশ্চিত ছিল। তবে সেনাপতিদের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা, কৌশলগত দূরদর্শিতার অভাব এবং চরম মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে নবাবের এই সম্ভাব্য বিজয় পরাজয়ে পর্যবসিত হয়।

১. ভূমিকা (Introduction)

বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সংঘর্ষ কেবল দুটি সামরিক বাহিনীর লড়াই ছিল না; এটি ছিল একটি উদীয়মান ঔপনিবেশিক শক্তি ও ক্ষয়িষ্ণু আঞ্চলিক রাজতন্ত্রের মধ্যকার শক্তির দ্বন্দ্ব। ১৭৫৬ সালে কাসিমবাজার ও কলকাতা দখল করে নবাব তাঁর সামরিক ক্ষমতার পরিচয় দিলেও, ইংরেজদের পুনর্দখল এবং চন্দননগর দখলের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ২৩ জুনের পলাশীর আম্রকাননে অর্জিত ইংরেজদের এই ‘সহজ বিজয়’ কোনো অলৌকিক সামরিক নৈপুণ্যের ফল ছিল না, বরং তা ছিল একটি গভীর ষড়যন্ত্র ও নবাবের কৌশলগত ভুলের সমষ্টি।

২. সামরিক সামর্থ্য ও শক্তির ভারসাম্য (Military Balance)

পলাশীর প্রাঙ্গণে উভয় পক্ষের বাহিনীর মধ্যে বিশাল ব্যবধান ছিল:

বৈশিষ্ট্যনবাব সিরাজউদ্দৌলার বাহিনীইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (রবার্ট ক্লাইভ)
সৈন্যসংখ্যাপ্রায় ৫০,০০০ (পদাতিক ও অশ্বারোহী)প্রায় ৩,০০০ (৯০০ ইউরোপীয়, ২,১০০ দেশীয় সিপাহি)
কামানের সংখ্যা৫৩টি ভারী কামান (ফরাসি গোলন্দাজ সহ)৫০টি হালকা কামান ও ফিল্ড পিস
গোলন্দাজ বাহিনীমীর মদন ও ফরাসি জেনারেল সিনফ্রেক্যাপ্টেন কিলপ্যাট্রিক ও ক্লাইভ

কেবল সংখ্যার বিচারে নবাবের বাহিনী ক্লাইভের বাহিনীর চেয়ে ১৫ গুণেরও বেশি বড় ছিল। মীর মদন ও মোহন লালের অধীনে থাকা বাধ্যগত অংশটুকুই (প্রায় ১২,০০০ সৈন্য) ক্লাইভের পুরো বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

৩. পরাজয়ের মূল কারণসমূহ (Key Factors of Defeat)

৩.১. অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা

নবাবের মূল বাহিনীর এক বিশাল অংশ (প্রায় ৩৫,০০০ সৈন্য) প্রধান সেনাপতি মীর জাফর, রায়দুর্লভ এবং ইয়ার লতিফ খানের অধীনে ছিল। তারা যুদ্ধের ময়দানে নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করে, যা নবাবের সামরিক ভারসাম্যকে একতরফাভাবে দুর্বল করে দেয়।

৩.২. বৃষ্টি ও বারুদ রক্ষার ব্যর্থতা

দুপুরের দিকে হঠাৎ ভারী বৃষ্টিপাত হলে ইংরেজরা তাদের বারুদ ও ত্রিপল দিয়ে কামান ঢেকে রাখতে সক্ষম হয়। পক্ষান্তরে, নবাবের বারুদ উন্মুক্ত থাকায় তা ভিজে অকেজো হয়ে পড়ে।

৩.৩. মীর মদনের মৃত্যু ও কৌশলগত বিপর্যয়

বৃষ্টির পর নবাবের বীর সেনাপতি মীর মদন ভাবেন ইংরেজদের বারুদও ভিজে গেছে। তিনি অগ্রগতির নির্দেশ দেন, কিন্তু ইংরেজদের শুকনো কামানের গোলার আঘাতে তিনি প্রাণ হারান। মীর মদনের পতন নবাবকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলে।

৩.৪. মীর জাফরের ওপর ভুল আস্থা

মীর মদনের মৃত্যুর পর আতঙ্কিত নবাব মীর জাফরকে ডেকে পাঠান এবং কোরআন স্পর্শ করিয়ে দেশের স্বাধীনতা রক্ষার আকুতি জানান। মীর জাফর নবাবকে যুদ্ধ স্থগিতের পরামর্শ দেয় এবং বিশ্বস্ত সেনাপতি মোহন লালকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছু হটার নির্দেশ দিতে বাধ্য করে। মোহন লালের এই পিছু হটাই নবাবের বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে এবং ক্লাইভ সেই সুযোগে আক্রমণ চালায়।

৪. বিকল্প চিত্রপট: নবাব কীভাবে জয়ী হতে পারতেন? (Counterfactual Analysis)

ইতিহাসের সমসাময়িক দলিল ও সামরিক কৌশল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হলে নবাবের পক্ষে জয়লাভ করা পূর্ণমাত্রায় সম্ভব ছিল:

  1. সামরিক প্রধান হিসেবে মীর জাফরকে অপসারণ: যুদ্ধের পূর্বেই মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার স্পষ্ট প্রমাণ নবাবের হাতে ছিল। তাঁকে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে বরখাস্ত করে মীর মদন বা মোহন লালকে সর্বাধিনায়ক করলে সেনাবাহিনীর একটি বিরাট অংশ বিভ্রান্ত হতো না।
  2. বারুদ সংরক্ষণে সাধারণ সতর্কতা: ভিজা বারুদের কারণে নবাবের গোলন্দাজ বাহিনী অকেজো হয়ে পড়ে। সামান্য ত্রিপল বা চটের ব্যবস্থা রাখা হলে ইংরেজদের অগ্রগতি সহজেই স্তব্ধ করে দেওয়া যেত।
  3. মোহন লালের আক্রমণ অব্যাহত রাখা: মীর মদনের মৃত্যুর পরও মোহন লাল ও সিনফ্রে ফরাসি গোলন্দাজদের নিয়ে ইংরেজদের কোণঠাসা করে ফেলেছিলেন। নবাব যদি মীর জাফরের পরামর্শ না মেনে মোহন লালকে আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিতেন, তবে ক্লাইভ পিছু হটতে বাধ্য হতেন। রবার্ট ক্লাইভের নিজস্ব ডায়েরি থেকেও জানা যায় যে, তিনি একপর্যায়ে পিছু হটে কলকাতায় ফিরে যাওয়ার চিন্তাও করছিলেন।
  4. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ়তা: নবাব সিরাজউদ্দৌলার চরম মুহূর্তে সিদ্ধান্তহীনতা এবং মীর জাফরের ওপর অন্ধ বিশ্বাসই তাঁর পতন ডেকে আনে। কৌশলগতভাবে সাহসিকতা দেখালে ৩,০০০ সৈন্যের ইংরেজ বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করা অসম্ভব ছিল না।

৫. উপসংহার (Conclusion)

পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় কোনো সামরিক অযোগ্যতার ফল ছিল না, বরং এটি ছিল একটি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা। পর্যাপ্ত সৈন্য, ফরাসি গোলন্দাজদের সহায়তা এবং বীর সেনাপতিদের উপস্থিতি সত্ত্বেও কেবল ভুল সেনাপতি নির্বাচন এবং শত্রুর চক্রান্ত ধরতে না পারার কারণে একটি নিশ্চিত বিজয় হাতছাড়া হয়।

সুতরাং বলা যায়, নবাব সিরাজউদ্দৌলার পক্ষে পলাশীর যুদ্ধ জয় করা কেবল সম্ভবই ছিল না, বরং তা সামরিক বিচারে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি পরিণতি হতে পারত। কিন্তু দূরদর্শিতার অভাব এবং চরম মুহূর্তে ভুল নেতৃত্বের কারণে ভারতীয় উপমহাদেশ দুই শত বছরের জন্য ব্রিটিশ শাসনের অধীনে চলে যায়।

বিশ্বজয়ী আলেকজান্ডার কেন বাংলা আক্রমণ করেনি?

বিশ্ববিখ্যাত মেসিডোনিয়ান বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট বা মহামতি আলেকজান্ডার যখন একের পর এক রাজ্য জয় করে ভারতীয় উপমহাদেশে পৌঁছেছিলেন, তখন তাঁর অপ্রতিরোধ্য রথের গতি থমকে গিয়েছিল বাংলার দোরগোড়ায় এসে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে ঝিলামের যুদ্ধে (হিদাসপিসের যুদ্ধ) রাজা পুরুষোত্তম বা পোরাসকে পরাজিত করার পর আলেকজান্ডারের দৃষ্টি পড়েছিল আরও পূর্ব দিকে—অর্থাৎ গঙ্গা অববাহিকার সমৃদ্ধ অঞ্চল বাংলার দিকে।

কিন্তু কেন তিনি বাংলায় আক্রমণ না করেই ফিরে গিয়েছিলেন? ইতিহাসবিদদের মতে, এর নেপথ্যে রয়েছে কয়েকটি প্রধান রাজনৈতিক, সামরিক এবং মনস্তাত্ত্বিক কারণ:

১. গঙ্গার বিশালতা ও পরাক্রমশালী ‘গঙ্গারিডাই’ সেনা

গ্রিক ঐতিহাসিক ডিওডোরাস, প্লুটার্ক এবং কার্টিয়াসের লেখা থেকে জানা যায়, তৎকালীন বাংলা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ‘গঙ্গারিডাই’ (Gangaridai) এবং ‘প্রাসি’ (Prasii) নামে দুটি অতি শক্তিশালী রাজ্য অবস্থান করছিল।

  • প্রকাণ্ড হস্তীবাহিনী: গ্রিক বিবরণ অনুযায়ী, গঙ্গারিডাই ও প্রাসি রাজাদের সৈন্যদলে ছিল বিপুলসংখ্যক সুপ্রশিক্ষিত হাতি। প্লুটার্কের মতে, এই যৌথ বাহিনীর কাছে প্রায় ২০,০০০০০ পদাতিক, ৮০,০০০ অশ্বারোহী, ৮,০০০ রথ এবং ৬,০০০ যুদ্ধহস্তী ছিল।
  • ভীতি ও আতঙ্ক: মেসিডোনীয় সৈন্যরা রাজা পোরাসের সীমিতসংখ্যক হাতির সঙ্গেই যুদ্ধ করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছিল। গঙ্গারিডাইদের হাজার হাজার হাতির মুখোমুখি হওয়ার কল্পনা তাদের মনে তীব্র ভয়ের সঞ্চার করে।

২. মেসিডোনীয় সৈন্যদের চরম ক্লান্তি ও বিদ্রোহ

আলেকজান্ডারের সেনারা প্রায় আট বছর ধরে টানা বাড়ি-ঘর ছেড়ে যুদ্ধ করে আসছিল।

  • দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি: হাজার হাজার মাইল পথ অতিক্রম করা, ভারতের তীব্র তাপদাহ এবং বর্ষাকালের প্রবল বৃষ্টিপাত গ্রিক সৈন্যদের মানসিকভাবে ভেঙে ফেলেছিল।
  • সৈন্যদের বিদ্রোহ (Mutiny at Hyphasis): আলেকজান্ডার যখন বিপাশা (Hyphasis) নদী পার হয়ে বাংলায় প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি ও সৈনিকেরা স্পষ্টভাবে সামনে এগোতে অস্বীকৃতি জানায়। আলেকজান্ডারের ইতিহাসে এটিই ছিল তাঁর সৈন্যদের প্রথম খোলাখুলি বিদ্রোহ।

৩. অচেনা ভৌগোলিক পরিবেশ ও আবহাওয়া

ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের (বিশেষ করে বাংলা অঞ্চল) আবহাওয়া ও ভূপ্রকৃতি গ্রিক বাহিনীর পরিচিত পরিবেশের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।

  • নদী ও জলাভূমির বাধা: বাংলা ছিল নদীমাতৃক ও ঘন জঙ্গলে ঘেরা এলাকা। গঙ্গা নদীর অতিকায় বিস্তার পার হওয়া এবং জলাভূমিতে গ্রিকদের ‘ফাল্যাঙ্কস’ (Phalanx) কৌশল প্রয়োগ করা অত্যন্ত কঠিন ছিল।
  • রোগব্যাধি ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ: স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া এবং অচেনা ক্রান্তীয় রোগব্যাধি সৈন্যদের মনোবল গুঁড়িয়ে দিয়েছিল।

৪. রসদ ও যোগাযোগের অভাব

আলেকজান্ডার তাঁর মাতৃভূমি মেসিডোনিয়া এবং প্রশাসনিক কেন্দ্র পারস্য থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে অবস্থান করছিলেন। বাংলায় প্রবেশের অর্থ ছিল যোগাযোগ ও রসদ সরবরাহের পথ আরও দীর্ঘ ও দুর্বল করে ফেলা। শত্রুভাবাপন্ন অচেনা ভূখণ্ডে রসদ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালানো আলেকজান্ডারের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতো।

সংক্ষেপে: মহামতি আলেকজান্ডার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখলেও, বাংলা তৎকালীন ‘গঙ্গারিডাই’ সামরিক শক্তির ভীতিকর খবরাখবর, অতিকায় হস্তীবাহিনী, সৈন্যদের বিদ্রোহ এবং দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তির কারণেই বিপাশা নদীর তীর থেকেই ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।

ফলে, ইতিহাস রচনার সেই মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্তে বাংলা অধরাই থেকে যায় বিশ্ববিজয়ী আলেকজান্ডারের কাছে।

পলাশীর যুদ্ধে ফ্রেঞ্চদের ভূমিকা কী ছিলো?

পলাশীর যুদ্ধ এবং ফরাসিদের ভূমিকা: ইতিহাস ও ভূরাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রাঙ্গণে সংঘটিত যুদ্ধটি শুধুমাত্র বাংলা বা ভারতের ইতিহাসেই নয়, বরং বিশ্ব ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটেও এক বিশাল মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এই যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিজয়ের নেপথ্যে যে বৈশ্বিক কূটনৈতিক ও সামরিক রসায়ন সক্রিয় ছিল, তার অন্যতম প্রধান উপাদান ছিল ফরাসিদের (French) ভূমিকা।

১. সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ ও ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা

অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে ‘সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ’ (Seven Years’ War, 1756–1763) শুরু হয়। এই ইউরোপীয় দ্বন্দের আঁচ এসে পড়ে ভারতেও। ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্য এবং আধিপত্য বিস্তারের দৌড়ে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছিল প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে বাংলায় যখন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ইংরেজদের বিরোধিতা চরম আকার ধারণ করে, তখন স্বভাবতই ফরাসিরা নবাবের মিত্রপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়।

২. সিরাজউদ্দৌলার সাথে জোট ও ফরাসি সাহায্য

নবাব সিরাজউদ্দৌলা খুব ভালো করেই অনুধাবন করেছিলেন যে, ব্রিটিশদের ক্রমবর্ধমান শক্তি দমন করতে হলে ইউরোপীয় কোনো শক্তিমত্তার সাহায্য প্রয়োজন।

  • ফরাসি গোলন্দাজ বাহিনী: ফরাসি সেনাপতি জাঁ লঁ (Jean Law) এবং সাঁ ফ্রে (St. Frais)-এর নেতৃত্বে একটি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত গোলন্দাজ ও পদাতিক দল নবাবের বাহিনীকে সহায়তার জন্য প্রস্তুত করা হয়।
  • কূটনৈতিক যোগাযোগ: নবাবের সাথে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ফরাসিরা নবাবকে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ এবং সামরিক পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

৩. পলাশীর প্রান্তরে ফরাসিদের বীরত্বপূর্ণ অবদান

পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্রে যখন নবাবের প্রধান প্রধান সেনাপতিরা (বিশেষ করে মীর জাফর, ইয়ার লতিফ ও রায় দুর্লভ) বিশ্বাসঘাতকতা করে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছিলেন, তখন ফরাসি বাহিনীই ছিল নবাবের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও কার্যকর শক্তি।

  • সাঁ ফ্রের নেতৃত্বে গোলন্দাজ বহর: যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতি সাঁ ফ্রের (St. Frais) অধীনে ৫০ থেকে ৬০ জন ফরাসি সেনা একটি সুসজ্জিত গোলন্দাজ বহর পরিচালনা করেন। তারা একটি বড় জলাশয়ের পাশে অবস্থান নিয়ে ইংরেজদের ওপর ভারী কামান হামলা চালান।
  • নবাবের বিশ্বস্ত প্রতিরোধ: মীর মদন এবং মোহনলালের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফরাসি সেনারা ইংরেজ বাহিনীকে তীব্র চাপে ফেলে দিয়েছিল। যুদ্ধের প্রথম ভাগে ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ ফরাসিদের কামানের গোলার ভয়ে তার বাহিনীকে একটি আমবাগানে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিলেন।

৪. ফরাসিদের ভাগ্যবিপর্যয় ও পরাজয়ের কারণ

যুদ্ধের সম্ভাবনা ও প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও ফরাসিদের ভূমিকা নবাবকে বিজয়ী করতে পারেনি। এর মূল কারণগুলো হলো:

  1. বৃষ্টি ও গোলাবারুদ নষ্ট হওয়া: যুদ্ধের মধ্যভাগে আকস্মিক ভারী বৃষ্টিতে নবাবের গোলাবারুদ ভিজে অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফরাসি সেনাদল ত্রিপল বা প্লাস্টিক দিয়ে তাদের কামানের বারুদ ঢেকে রাখলেও নবাবের নিজস্ব বাহিনীর বারুদ নষ্ট হয়ে যায়।
  2. মীর মদনের মৃত্যু: দূরদর্শী ও সাহসী সেনাপতি মীর মদন কামানের গোলার আঘাতে নিহত হওয়ার পর নবাব মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
  3. মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা: মীর জাফরের মিথ্যা আশ্বাসে নবাব যখন ফরাসি এবং তার বিশ্বস্ত সেনাদলকে যুদ্ধ থামানোর নির্দেশ দেন, তখন ফরাসি সেনাপতি সাঁ ফ্রে প্রবল আপত্তি জানান। কিন্তু নবাবের আদেশে শেষ পর্যন্ত তাদের অবস্থান ত্যাগ করতে হয়। এই সুযোগে ক্লাইভ আক্রমণ চালিয়ে ময়দান দখল করে নেন।

উপসংহার

পলাশীর যুদ্ধে ফরাসিদের ভূমিকা ছিল এক বীরত্বপূর্ণ অথচ করুণ অনুচ্ছেদ। তারা যদি সংখ্যায় আরও বেশি হতো বা মীর জাফরের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করা সম্ভব হতো, তবে হয়তো ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। পলাশীর যুদ্ধে ফরাসিদের পরাজয় কেবল সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটায়নি, বরং বাংলা তথা পুরো ভারতে ফরাসি সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্নের চিরসমাপ্তি ঘটিয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।