সম্রাট হর্ষবর্ধন কী বাংলার স্বাধীন রাজা শশাঙ্ককে থামাতে পেরেছিল?

সপ্তম শতকের প্রাচীন ভারতের ইতিহাস ছিল চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার লড়াইয়ে পূর্ণ। এই সময়ে উত্তর ভারতের অধিপতি কনৌজের সম্রাট হর্ষবর্ধন এবং বাংলার প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম নরপতি রাজা শশাঙ্কের মধ্যকার দ্বন্দ ছিল তৎকালীন রাজনীতির মূল আকর্ষণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, উত্তর ভারতের পরাক্রমশালী সম্রাট হর্ষবর্ধন কি সত্যিই বাংলার প্রতাপশালী রাজা শশাঙ্ককে পরাস্ত বা দমন করতে পেরেছিলেন?

ইতিহাসের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সম্রাট হর্ষবর্ধন তাঁর জীবনদ্দশায় শশাঙ্ককে পুরোপুরি থামানো বা জয় করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

১. সংঘাতের পটভূমি

কনৌজের শাসক রাজ্যবর্ধন (হর্ষবর্ধনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা) এবং মালবের রাজার যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দের সূত্রপাত। হর্ষবর্ধনের ভগ্নিপতি গৃহবর্মাকে হত্যা করা হলে রাজ্যবর্ধন মালব অভিযান করেন। এ সময় গৌড়রাজ শশাঙ্ক কনৌজ ও মালবের রাজপরিবারের মধ্যকার এই দ্বন্দে হস্তক্ষেপ করেন এবং কৌশলগত কারণে রাজ্যবর্ধনকে হত্যা করেন।

ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ এবং বোন রাজ্যশ্রীকে উদ্ধারের পণ নিয়ে ১৬ বছর বয়সে কনৌজের সিংহাসনে বসেন হর্ষবর্ধন। শশাঙ্ককে উচ্ছেদ করার উদ্দেশ্যে তিনি কামরূপের (আসাম) রাজা ভাস্করবর্মনের সাথে একটি শক্তিশালী সামরিক মিত্রতা গড়ে তোলেন।

২. হর্ষবর্ধনের সামরিক অভিযান ও বাস্তবতা

শশাঙ্ককে শাস্তি দিতে হর্ষবর্ধন বিশাল বাহিনী নিয়ে পূর্ব অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করেন। তবে এই সামরিক অভিযানের ফলাফল নিয়ে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের বিবরণ এবং বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’ কাব্য পর্যালোচনা করলে ঐতিহাসিক সত্য সামনে আসে:

  • আংশিক দখল ও শশাঙ্কের পিছু হটা: হর্ষবর্ধন ও ভাস্করবর্মনের যৌথ বাহিনীর চাপে শশাঙ্ক কৌশলগতভাবে গৌড়ের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ ছেড়ে ওড়িশা (কনগোদা) অঞ্চলে সরে যান। হর্ষবর্ধন কনৌজ ও গৌড়ের কিছু অংশ সাময়িকভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন।
  • শশাঙ্কের সার্বভৌমত্ব বহাল: রাজধানী ছেড়ে গেলেও শশাঙ্ক তাঁর রাজ্যের মূল শক্তি হারাননি। তিনি দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা, ওড়িশা এবং বিহারের কিছু অংশজুড়ে নিজের শাসন পূর্ণ শক্তিতে টিকিয়ে রাখেন। হর্ষবর্ধন শশাঙ্কের সাম্রাজ্য পুরোপুরি গ্রাস করতে বা তাঁকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে পারেননি।

৩. হিউয়েন সাঙের সাক্ষ্য ও ঐতিহাসিক প্রমাণ

চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ (যিনি হর্ষবর্ধনের পরম ভক্ত ছিলেন) তাঁর বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন যে, শশাঙ্কের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত গৌড় এবং তার আশেপাশের অঞ্চলে শশাঙ্কের প্রভাব অক্ষুণ্ণ ছিল। হর্ষবর্ধনের মতো শক্তিশালী শাসক থাকা সত্ত্বেও শশাঙ্ক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত (আনুমানিক ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দ) স্বাধীনভাবেই রাজত্ব করে গেছেন।

শশাঙ্কের জীবদ্দশায় হর্ষবর্ধন কিংবা ভাস্করবর্মন কাউকেই বাংলায় স্থায়ী কর্তৃত্ব স্থাপন করতে দেখা যায়নি।

৪. শশাঙ্কের মৃত্যুর পর পরিবর্তন

শশাঙ্কের মৃত্যুর পরই কেবল হর্ষবর্ধন ও কামরূপরাজ ভাস্করবর্মন গৌড় ও মগধ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন। অর্থাৎ, শশাঙ্ককে যুদ্ধে পরাজিত বা হত্যা করে নয়, বরং শশাঙ্কের স্বাভাবিক মৃত্যুর পরেই হর্ষবর্ধন বাংলা অঞ্চলে তাঁর পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করতে সমর্থ হন।

উপসংহার

সংক্ষেপে বলতে গেলে, সম্রাট হর্ষবর্ধন রাজা শশাঙ্ককে সাময়িকভাবে প্রতিহত করতে এবং তাঁর সাম্রাজ্যের বিস্তার থামাতে পেরেছিলেন, কিন্তু শশাঙ্ককে স্থায়ীভাবে পরাজিত, বন্দী বা থামাতে তিনি সফল হননি। রাজকীয় কূটনীতি, সামরিক প্রজ্ঞা এবং ভৌগোলিক সুবিধার কারণে রাজা শশাঙ্ক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করতে পেরেছিলেন। তাই ইতিহাসে সম্রাট হর্ষবর্ধন মহা-পরাক্রমশালী রাজা হিসেবে পরিচিত হলেও, স্বাধীন গৌড়রাজ শশাঙ্ক তাঁর কাছে এক অদম্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই থেকে যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *