বিশ্বজয়ী আলেকজান্ডার কেন বাংলা আক্রমণ করেনি?

বিশ্ববিখ্যাত মেসিডোনিয়ান বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট বা মহামতি আলেকজান্ডার যখন একের পর এক রাজ্য জয় করে ভারতীয় উপমহাদেশে পৌঁছেছিলেন, তখন তাঁর অপ্রতিরোধ্য রথের গতি থমকে গিয়েছিল বাংলার দোরগোড়ায় এসে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে ঝিলামের যুদ্ধে (হিদাসপিসের যুদ্ধ) রাজা পুরুষোত্তম বা পোরাসকে পরাজিত করার পর আলেকজান্ডারের দৃষ্টি পড়েছিল আরও পূর্ব দিকে—অর্থাৎ গঙ্গা অববাহিকার সমৃদ্ধ অঞ্চল বাংলার দিকে।

কিন্তু কেন তিনি বাংলায় আক্রমণ না করেই ফিরে গিয়েছিলেন? ইতিহাসবিদদের মতে, এর নেপথ্যে রয়েছে কয়েকটি প্রধান রাজনৈতিক, সামরিক এবং মনস্তাত্ত্বিক কারণ:

১. গঙ্গার বিশালতা ও পরাক্রমশালী ‘গঙ্গারিডাই’ সেনা

গ্রিক ঐতিহাসিক ডিওডোরাস, প্লুটার্ক এবং কার্টিয়াসের লেখা থেকে জানা যায়, তৎকালীন বাংলা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ‘গঙ্গারিডাই’ (Gangaridai) এবং ‘প্রাসি’ (Prasii) নামে দুটি অতি শক্তিশালী রাজ্য অবস্থান করছিল।

  • প্রকাণ্ড হস্তীবাহিনী: গ্রিক বিবরণ অনুযায়ী, গঙ্গারিডাই ও প্রাসি রাজাদের সৈন্যদলে ছিল বিপুলসংখ্যক সুপ্রশিক্ষিত হাতি। প্লুটার্কের মতে, এই যৌথ বাহিনীর কাছে প্রায় ২০,০০০০০ পদাতিক, ৮০,০০০ অশ্বারোহী, ৮,০০০ রথ এবং ৬,০০০ যুদ্ধহস্তী ছিল।
  • ভীতি ও আতঙ্ক: মেসিডোনীয় সৈন্যরা রাজা পোরাসের সীমিতসংখ্যক হাতির সঙ্গেই যুদ্ধ করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছিল। গঙ্গারিডাইদের হাজার হাজার হাতির মুখোমুখি হওয়ার কল্পনা তাদের মনে তীব্র ভয়ের সঞ্চার করে।

২. মেসিডোনীয় সৈন্যদের চরম ক্লান্তি ও বিদ্রোহ

আলেকজান্ডারের সেনারা প্রায় আট বছর ধরে টানা বাড়ি-ঘর ছেড়ে যুদ্ধ করে আসছিল।

  • দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি: হাজার হাজার মাইল পথ অতিক্রম করা, ভারতের তীব্র তাপদাহ এবং বর্ষাকালের প্রবল বৃষ্টিপাত গ্রিক সৈন্যদের মানসিকভাবে ভেঙে ফেলেছিল।
  • সৈন্যদের বিদ্রোহ (Mutiny at Hyphasis): আলেকজান্ডার যখন বিপাশা (Hyphasis) নদী পার হয়ে বাংলায় প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি ও সৈনিকেরা স্পষ্টভাবে সামনে এগোতে অস্বীকৃতি জানায়। আলেকজান্ডারের ইতিহাসে এটিই ছিল তাঁর সৈন্যদের প্রথম খোলাখুলি বিদ্রোহ।

৩. অচেনা ভৌগোলিক পরিবেশ ও আবহাওয়া

ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের (বিশেষ করে বাংলা অঞ্চল) আবহাওয়া ও ভূপ্রকৃতি গ্রিক বাহিনীর পরিচিত পরিবেশের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।

  • নদী ও জলাভূমির বাধা: বাংলা ছিল নদীমাতৃক ও ঘন জঙ্গলে ঘেরা এলাকা। গঙ্গা নদীর অতিকায় বিস্তার পার হওয়া এবং জলাভূমিতে গ্রিকদের ‘ফাল্যাঙ্কস’ (Phalanx) কৌশল প্রয়োগ করা অত্যন্ত কঠিন ছিল।
  • রোগব্যাধি ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ: স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া এবং অচেনা ক্রান্তীয় রোগব্যাধি সৈন্যদের মনোবল গুঁড়িয়ে দিয়েছিল।

৪. রসদ ও যোগাযোগের অভাব

আলেকজান্ডার তাঁর মাতৃভূমি মেসিডোনিয়া এবং প্রশাসনিক কেন্দ্র পারস্য থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে অবস্থান করছিলেন। বাংলায় প্রবেশের অর্থ ছিল যোগাযোগ ও রসদ সরবরাহের পথ আরও দীর্ঘ ও দুর্বল করে ফেলা। শত্রুভাবাপন্ন অচেনা ভূখণ্ডে রসদ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালানো আলেকজান্ডারের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতো।

সংক্ষেপে: মহামতি আলেকজান্ডার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখলেও, বাংলা তৎকালীন ‘গঙ্গারিডাই’ সামরিক শক্তির ভীতিকর খবরাখবর, অতিকায় হস্তীবাহিনী, সৈন্যদের বিদ্রোহ এবং দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তির কারণেই বিপাশা নদীর তীর থেকেই ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।

ফলে, ইতিহাস রচনার সেই মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্তে বাংলা অধরাই থেকে যায় বিশ্ববিজয়ী আলেকজান্ডারের কাছে।