পলাশীর যুদ্ধে ফ্রেঞ্চদের ভূমিকা কী ছিলো?

পলাশীর যুদ্ধ এবং ফরাসিদের ভূমিকা: ইতিহাস ও ভূরাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রাঙ্গণে সংঘটিত যুদ্ধটি শুধুমাত্র বাংলা বা ভারতের ইতিহাসেই নয়, বরং বিশ্ব ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটেও এক বিশাল মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এই যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিজয়ের নেপথ্যে যে বৈশ্বিক কূটনৈতিক ও সামরিক রসায়ন সক্রিয় ছিল, তার অন্যতম প্রধান উপাদান ছিল ফরাসিদের (French) ভূমিকা।

১. সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ ও ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা

অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে ‘সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ’ (Seven Years’ War, 1756–1763) শুরু হয়। এই ইউরোপীয় দ্বন্দের আঁচ এসে পড়ে ভারতেও। ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্য এবং আধিপত্য বিস্তারের দৌড়ে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছিল প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে বাংলায় যখন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ইংরেজদের বিরোধিতা চরম আকার ধারণ করে, তখন স্বভাবতই ফরাসিরা নবাবের মিত্রপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়।

২. সিরাজউদ্দৌলার সাথে জোট ও ফরাসি সাহায্য

নবাব সিরাজউদ্দৌলা খুব ভালো করেই অনুধাবন করেছিলেন যে, ব্রিটিশদের ক্রমবর্ধমান শক্তি দমন করতে হলে ইউরোপীয় কোনো শক্তিমত্তার সাহায্য প্রয়োজন।

  • ফরাসি গোলন্দাজ বাহিনী: ফরাসি সেনাপতি জাঁ লঁ (Jean Law) এবং সাঁ ফ্রে (St. Frais)-এর নেতৃত্বে একটি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত গোলন্দাজ ও পদাতিক দল নবাবের বাহিনীকে সহায়তার জন্য প্রস্তুত করা হয়।
  • কূটনৈতিক যোগাযোগ: নবাবের সাথে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ফরাসিরা নবাবকে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ এবং সামরিক পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

৩. পলাশীর প্রান্তরে ফরাসিদের বীরত্বপূর্ণ অবদান

পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্রে যখন নবাবের প্রধান প্রধান সেনাপতিরা (বিশেষ করে মীর জাফর, ইয়ার লতিফ ও রায় দুর্লভ) বিশ্বাসঘাতকতা করে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছিলেন, তখন ফরাসি বাহিনীই ছিল নবাবের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও কার্যকর শক্তি।

  • সাঁ ফ্রের নেতৃত্বে গোলন্দাজ বহর: যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতি সাঁ ফ্রের (St. Frais) অধীনে ৫০ থেকে ৬০ জন ফরাসি সেনা একটি সুসজ্জিত গোলন্দাজ বহর পরিচালনা করেন। তারা একটি বড় জলাশয়ের পাশে অবস্থান নিয়ে ইংরেজদের ওপর ভারী কামান হামলা চালান।
  • নবাবের বিশ্বস্ত প্রতিরোধ: মীর মদন এবং মোহনলালের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফরাসি সেনারা ইংরেজ বাহিনীকে তীব্র চাপে ফেলে দিয়েছিল। যুদ্ধের প্রথম ভাগে ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ ফরাসিদের কামানের গোলার ভয়ে তার বাহিনীকে একটি আমবাগানে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিলেন।

৪. ফরাসিদের ভাগ্যবিপর্যয় ও পরাজয়ের কারণ

যুদ্ধের সম্ভাবনা ও প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও ফরাসিদের ভূমিকা নবাবকে বিজয়ী করতে পারেনি। এর মূল কারণগুলো হলো:

  1. বৃষ্টি ও গোলাবারুদ নষ্ট হওয়া: যুদ্ধের মধ্যভাগে আকস্মিক ভারী বৃষ্টিতে নবাবের গোলাবারুদ ভিজে অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফরাসি সেনাদল ত্রিপল বা প্লাস্টিক দিয়ে তাদের কামানের বারুদ ঢেকে রাখলেও নবাবের নিজস্ব বাহিনীর বারুদ নষ্ট হয়ে যায়।
  2. মীর মদনের মৃত্যু: দূরদর্শী ও সাহসী সেনাপতি মীর মদন কামানের গোলার আঘাতে নিহত হওয়ার পর নবাব মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
  3. মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা: মীর জাফরের মিথ্যা আশ্বাসে নবাব যখন ফরাসি এবং তার বিশ্বস্ত সেনাদলকে যুদ্ধ থামানোর নির্দেশ দেন, তখন ফরাসি সেনাপতি সাঁ ফ্রে প্রবল আপত্তি জানান। কিন্তু নবাবের আদেশে শেষ পর্যন্ত তাদের অবস্থান ত্যাগ করতে হয়। এই সুযোগে ক্লাইভ আক্রমণ চালিয়ে ময়দান দখল করে নেন।

উপসংহার

পলাশীর যুদ্ধে ফরাসিদের ভূমিকা ছিল এক বীরত্বপূর্ণ অথচ করুণ অনুচ্ছেদ। তারা যদি সংখ্যায় আরও বেশি হতো বা মীর জাফরের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করা সম্ভব হতো, তবে হয়তো ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। পলাশীর যুদ্ধে ফরাসিদের পরাজয় কেবল সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটায়নি, বরং বাংলা তথা পুরো ভারতে ফরাসি সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্নের চিরসমাপ্তি ঘটিয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *